ঢাকা , শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬ , ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৪৩ জনের আউটসোর্সিং নিয়োগে সচিবালয়ের অনুমোদন, বিপিপিএর ছাড় ও মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ; তদন্তের আগেই একক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় নিয়োগ, বরখাস্ত শুধু আঞ্চলিক কর্মকর্তা

মাসুদ রানা রাব্বানী
আপডেট সময় : ২০২৬-০৭-২৫ ১৮:১৭:৪০
কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় নিয়োগ, বরখাস্ত শুধু আঞ্চলিক কর্মকর্তা কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় নিয়োগ, বরখাস্ত শুধু আঞ্চলিক কর্মকর্তা


মাসুদ রানা রাব্বানী, রাজশাহী: রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ১৪৩ জন জনবল নিয়োগে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমানকে। তবে সরকারি নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, পুরো নিয়োগ কার্যক্রমটি ছিল নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের লিখিত নির্দেশনা, বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) বিশেষ অনুমোদন এবং মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের ধারাবাহিকতায় সম্পন্ন। 

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, যে নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত, অনুমোদন ও কমিটির সুপারিশ ছিল, সেই প্রক্রিয়ার দায় কি শুধু একজন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার? নাকি তদন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরের ভূমিকা সমানভাবে মূল্যায়ন করা হবে? 

এই প্রতিবেদকের হাতে থাকা সরকারি নথি অনুযায়ী, গত ২৩ জুন ২০২৬ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নাজমুল কবিরের স্বাক্ষরিত কপিতে যার স্মারক নম্বর: ১৭,০০,০০০০.০১৬.১১.০১৫.২১-৩১৫ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন সচিবালয় দেশের সব আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের নির্দেশ দেয়। একই দিনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) ই-জিপির পরিবর্তে ডাইরেক্ট প্রোকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) অনুসরণের অনুমোদন দেয়। নির্দেশনায় ৩০ জুনের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এরপর ২৪ জুন সিনিয়র সহকারী সচিব নাজমুল কবীরের স্বাক্ষরিত কপিতে স্মারক নম্বর: ১৭,০০,০০০০.০১৬.১১.০১৫.২১-৩১৬ এ মূল্যায়ন কমিটি গঠন ও অনুমোদন, ২৫ জুন দরপত্র আহ্বান, ২৭ জুন স্মারক নম্বর-১৭.০৪.০০০০.০০০.০৮১.০০৬.২৬-৫৭৩ এ মূল্যায়ন কমিটির সভা ও সুপারিশ এবং ২৯ জুন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অনুমোদনের পর কেএসএফ ট্রেড লিমিটেডকে কার্যাদেশ (Notification of Award) দেওয়া হয়। একই দিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলের নির্বাচন কার্যালয়গুলোতে ৫ জন চালক, ৬৯ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ৬৯ জন নিরাপত্তা প্রহরীসহ মোট ১৪৩ জন জনবল সরবরাহের দায়িত্ব পায় প্রতিষ্ঠানটি।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের পৃথক নির্দেশনায় আগে থেকেই কর্মরত আউটসোর্সিং কর্মীদের অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়। সে অনুযায়ী ১৩৭ জন কর্মরত কর্মীর তালিকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি ১৪৩ জনের চূড়ান্ত তালিকা জমা দিলে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে পর্যায়ক্রমে কর্মীরা যোগদান করেন।

সম্প্রতি স্যোসাল মিডিয়া ও ইউটিউবভিত্তিক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, নিয়োগপ্রাপ্তদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে এবং কোনো লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু করে।

তবে এই প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্রে নিয়োগ কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপের অনুমোদন, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, কার্যাদেশ ও চুক্তির তথ্য মিললেও ঘুষ লেনদেনের পক্ষে কোনো সরকারি নথি, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য কিংবা অন্য কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে অভিযোগ উত্থাপনকারী স্যোসাল মিডিয়া বা ইউটিউব প্রতিবেদনে অর্থ লেনদেনের সমর্থনে কোনো যাচাইযোগ্য নথিও প্রকাশ করা হয়নি। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে অভিযোগটি সত্য নয় বা মিথ্যা—এটির সত্যতা নির্ধারণ করবে চলমান তদন্ত।

অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। গত ২১ জুলাই স্মারক ১৭,০০,০০০০.০৮৩.২৭.০০৬৩.২৬-৬০৮ এ উপসচিব (শৃঙ্খলা) সালাহউদ্দীন আহমদের স্বাক্ষরিত আদেশে যুগ্ম সচিব (প্রশাসন ও অর্থ) ডিএম আতিকুর রহমানকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ১৪৩ জন কর্মী নিয়োগে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করতেই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।

নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, মূল্যায়ন কমিটি, বিপিপিএ এবং জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পৃথক পৃথক ভূমিকা ছিল। কিন্তু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কেবল আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

এতে প্রশ্ন উঠেছে, তদন্ত কি শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার ভূমিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও সমানভাবে যাচাই করা হবে?

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা নির্বাচন অফিসে কর্মরত আউটসোর্সিং চালক ইসমাইল হোসেন কালবেলাকে জানান, তিনি ২০১৬ সাল থেকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মরত রয়েছেন। চলতি বছরের জুলাই মাসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যোগদানপত্র সংগ্রহ করেছেন। এ প্রক্রিয়ায় তাঁর কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি এবং কেউ টাকাও দাবি করেনি।

বোয়ালিয়া থানা নির্বাচন অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ফারুক হোসেন কালবেলাকে জানান, তিনি ২০২৩ সালে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেন। ২০২৫ সালের নীতিমালায় অভিজ্ঞ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান অনুযায়ী পুনরায় নিয়োগ পেয়েছেন। এ নিয়োগেও তাঁর কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি।

২০২৩ সালে যোগদানকৃত রাজপাড়া থানা নির্বাচন অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সাব্বির হোসেনও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে বলেন, নতুন কাউকে নিয়োগ না দিয়ে আগের কর্মীদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তাঁর ক্ষেত্রেও কোনো অর্থ লেনদেন হয়নি।

কেএসএফ ট্রেড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামীম হোসাইন কালবেলাকে বলেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা এবং কেন্দ্রীয় অনুমোদনের ভিত্তিতেই আগের কর্মীদের বহাল রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্বভাবে কোনো তালিকা তৈরি করেনি; নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তালিকা অনুযায়ীই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রতিষ্ঠানের অগোচরে কেউ ব্যক্তিগতভাবে অর্থ নিয়ে থাকলে তার দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না।

রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান কালবেলাকে জানান, সরকার নির্ধারিত নীতিমালা ও বিধিবিধান অনুসরণ করেই পুরো নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিধিবিধানের ব্যত্যয় ঘটেনি বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব ও তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ডিএম আতিকুর রহমান কালবেলাকে জানান, তদন্ত না করে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। তদন্ত চলছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে তখন বিষয়টি জানানো সম্ভব হবে।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রকৃতপক্ষে অনিয়ম হয়েছে কি না, ঘুষের অভিযোগের বাস্তবতা কী, আর যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে তার দায় কার? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত প্রতিবেদনে। তবে সরকারি নথিতে যখন দেখা যাচ্ছে পুরো প্রক্রিয়াটি কেন্দ্রীয় নির্দেশনা, বিপিপিএর অনুমোদন, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ এবং সচিবালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে, তখন অনুসন্ধানসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, বহুস্তরের সিদ্ধান্তে সম্পন্ন একটি প্রক্রিয়ার প্রশাসনিক দায় কি কেবল একজন কর্মকর্তার ওপরই বর্তাবে, নাকি তদন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তর সমানভাবে মূল্যায়িত হবে?

 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Banglar Alo News Admin

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ